সর্বশেষ লেখাসমূহ:
অণুগল্পের ব্যাকরণ

অণুগল্পের ব্যাকরণ

Print Friendly, PDF & Email

হাসান রাউফুন

প্রাককথন
উপন্যাস যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তখন ছোটগল্প তৈরির প্রয়াস শুরু হয় এবং অল্পসময়ের মধ্যে তা জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আধুনিককালে এসে গল্পকে সাইজে ছোট করে অণুগল্প লেখার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন অনেকেই। উপন্যাসকে ছোট করে উপন্যাসিকা, আরো ছোট করে বড় গল্প, আরো ছোট করে ছোটগল্প, আরো ছোট করে অণুগল্প এভাবে আয়তনের মধ্যে ফেলে কোনো সাহিত্যের রূপ মূল্যায়ন করা যায় না; শুধু নামকরণ ছাড়া। অণুগল্পকে অনেকে মিনিগল্প বা ক্ষুদ্রগল্প বলে পরিসরে ছোট করে একধরনের কাহিনি তৈরি করে থাকেন যা নিশ্চয়ই অণুগল্প নয়। বিদেশি কোনো গল্পকার ৫/১০ মিনিটে পড়েফেলা যায় এমন গল্পকেও ছোটগল্প বলে আখ্যা দিয়েছেন। অনেকে বানানের দিক দিয়েও ভুল লেখেন- অনুগল্প। অনু হলো উপসর্গ। উপসর্গের অর্থ থাকে না কিন্তু অনুর অর্থ আছে। অনু অর্থ অনুরূপ বা পশ্চাৎ বা পেছন। সেক্ষেত্রে অনুগল্প অর্থ পেছনের গল্প। বানানের দিক দিয়ে হবে অণুগল্প। অণু অর্থ সূক্ষ্মতম। অণুকে যখন বীক্ষণ অর্থাৎ বিশেষভাবে দর্শন বা পর্যবেক্ষণ করা হয় তখন হয় অণুবীক্ষণ; এটি যে যন্ত্রের মাধ্যমে করা হয় সেটি হয় অণুবীক্ষণ যন্ত্র। তাই অণুগল্প যে অর্থ বহন করে সেই অর্থ মিনিগল্প বহন করে না। গল্প ছোট করলে মিনিগল্প হতে পারে তবে অণুগল্প হতে পারে না।
সূত্র বা বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃজনশীল সাহিত্য রচনা করা সম্ভব নয়। তবুও গবেষকগণ /ব্যাকরণবিদগণ এসব লিখে কিছু রচনা করতে সহজ করে দেন। গবেষকগণের জানানো দিক লেখক নিজের জানার সাথে মিলিয়ে নতুন কিছু তৈরি করেন অথবা সাহিত্য নির্মাণে সতর্ক হন। নিয়ম জানলেই নিয়ম ভাঙা সহজ হয়, এমনই বলেছিলেন নিরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের সংজ্ঞায় একদল বিতর্কের মাতলেও আরেকদল কিন্তু কম লাভবান হয়নি।

অণুগল্প বা রূপকগল্প বা প্রতীকী গল্প
বিশেষভাবে কাহিনিকে বিশেষ আকৃতিতে প্রতীক বা রূপকভাবে উপস্থান করলে হবে অণুগল্প। আকৃতিতে ছোট কিন্তু বিশেষ অর্থপূর্ণ বা দ্বৈতনাময় কাহিনিকে অণুগল্প/ রূপকগল্প/প্রতীকীগল্প বলে। অন্যভাবে বলা যায়, বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে উপস্থাপিত ইঙ্গিতপূর্ণ গল্পকে অণুগল্প/রূপকগল্প/প্রতীকীগল্প বলে।

অণুগল্পের বৈশিষ্ট্য
কোনো সৃজনশীল রচনার বৈশিষ্ট্য থাকে না বা বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করে কোনো সৃজনশীল রচনা রচিত হয় না। আগে সৃজনশীল কাজ রচিত হয় পরে ব্যাকরণবিদ তার বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করেন। সেদিক দিয়ে একটি অণুগল্পের কিছু বৈশিষ্ট্য ধারণা করা যায়। এজাতীয় গল্পের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জগদীশ ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘সংকেতময় সংক্ষিপ্ত কয়েকটি বাক্যবিন্যাসে পরিবেশ প্রস্তুত করে উপসংহার-বাক্যে অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত অথচ অনিবার্যভাবে ভাবসত্যের বিদ্যুৎবিকাশই এর বৈশিষ্ট্য।’ ঈশপের বা তলস্তয়ের গল্পগুলোই অণুগল্পের পূর্বপুরুষ। যদিও তলস্তয় ও ইশপ গল্পকে নিজের মতো করে উপস্থাপন করেছেন। তবে সেখানে হালকা বর্ণনায় কাহিনিগুলো নীতিকথায় উপস্থাপিত হয়েছে। আস্তে আস্তে অণুগল্প রূপ নিল প্রতীকী ভাবধারায়। যদিও ওসব গল্প প্রতীকীতেও প্রকাশ পেয়েছে। অমারা মনে করি, বাংলাসাহিত্যে খাঁটি অণুগল্পের জন্মদাতা বনফুল। শাহেদ আলীও শ্রেষ্ঠ অণুগল্প রচয়িতা।
অনুগল্পকারদের অণুগল্প থেকে কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা যায়। যেমন:
১. অণুগল্প সনেটের মতো পরিকল্পিত রচনা। সনেট যেমন নকশিকাঁথার মতো সেলাইকরা কারুকাজ; তেমনি অণুগল্পও। অণুগল্পকে রূপক কবিতার সাথেও তুলনা করা হয়।
২. অণুগল্প দুটি বা তিনটি অনুচ্ছেদে উপস্থাপন করা একটি ক্ষুদ্র কাহিনি যা প্রথম দুটি অনুচ্ছেদে গল্পের সহজভাব থাকে আর তৃতীয় অনুচ্ছেদে থাকে চমকানোর মতো একটি ক্ষুদ্র কাহিনি যা আগের অনুচ্ছেদে সাথে কথায় মিল না থাকলেও রূপকার্থে মিল থাকে।
৩. অণুগল্পের প্রথম বা প্রথম দুটি অনুচ্ছেদ সাদামাটা উপস্থাপন আর শেষপর্বে বলিষ্ঠ ও অগাধ জীবনবোধপূর্ণ উপস্থাপন যার উদগাতা তৃতীয়নয়ন।
৪. একটি উপন্যাস বা গল্পের মধ্যে অণুগল্প থাকতে পারে তবে অণুগল্পের মধ্যে উপন্যাস বা গল্পের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে না।
৫. অণুগল্পের পরিধি বা আঙ্গিক ক্ষুদ্র অথচ বক্তব্য পূর্ণাঙ্গ, তাৎপর্যপূর্ণ ও বিস্তর অর্থপূর্ণ।
৬. অণুগল্পের বাক্য কবিতার মতো শক্তিশালী, দৃঢ় ও অলংকারময় অর্থাৎ উপমা ও চিত্রকল্পময়। অণুগল্প গদ্য হলেও উপস্থাপন কাব্যিক, ব্যঞ্জনাময়, রূপক/প্রতীকী ও চিত্রকল্পময়।
৭. অণুই গল্পের চরিত্র। অণুই গল্পে বিষয় আর অণুপ্রাণে গড়ে তোলা হয় বিশ্বসমাজ ক্ষণিক আভায়। চমৎকার ও উপযুক্ত শব্দের গাঁথুনিতে, উপমায় উপমায় অণুগল্পের অবয়ব গঠিত হয়।
৮. অণুগল্পে বিনোদন বা হাস্যরসের জায়গা নাই বললেই চলে। তবে এটি সবচে বেশি মনন বা বোধের জায়গা। এজাতীয় গল্পে বিনোদনের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তির কাজ করে বেশি।
৯. অনুগল্পের চরিত্র সরাসারি না এসে কোনো গাছ বা প্রাণী আসতে পারে। যেমন এসেছে ইশপ্ ও তলস্তয়ের গল্পে।
১০. অণুগল্পের নীতিকথা থাকে আড়ালে।
নমুনা হিসেবে ‘নিমগাছ’ গল্পটির কথা বলতে পারি। যেমন:

নিমগাছ
কেউ ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করছে। পাতাগুলো ছিড়ে শিলে পিশছে কেউ! কেউ বা ভাজছে গরম তেলে। খোস, দাদ, হাজা ও চুলকানিতে লাগাবে। চর্মরোগের অব্যর্থ মহৌষধ। কচিপাতাগুলো খায়ও অনেকে, এমনি কাঁচাই…। কিম্বা ভেজে বেগুনসহযোগে। যকৃতের পক্ষে ভারি উপকার। কচি ডালগুলো ভেঙে চিবোয় কত লোক…দাঁত ভালো থাকে। কবিরাজরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বাড়ির পাশে গজালে বিজ্ঞরা খুশি হন। বলেন, ‘নিমের হাওয়া ভালো, থাক, কেটো না।’ কাটে না কিন্তু যত্নও করে না। আবর্জনা জমে এসে চারিদিক। শান দিয়ে বাঁধিয়ে দেয় কেউ, সে আর এক আবর্জনা।

হঠাৎ একদিন একটা নতুন ধরনের লোক এলো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল নিমগাছটির দিকে। ছাল তুললে না, পাতা ছিঁড়লে না, ডাল ভাঙলে না, মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল শুধু। বলে উঠল-‘বাহ! কী সুন্দর পাতাগুলো। কী রূপ! থোকা থোকা ফুলেরই কী বাহার… একঝাক নক্ষত্র নেমে এসেছে যেন নীর আকাশ থেকে সবুজ সায়রে। বাহ!’ খানিক্ষণ চেয়ে থেকে চলে গেলো। কবিরাজ নয়, কবি। নিমগাছটির ইচ্ছে করতে লাগল লোকটির সঙ্গে চলে যায়। কিন্তু পারলে না। মাটির ভিতর শিকড় অনেক দূর চলে গেছে। বাড়ির পিছনে আবর্জনার স্তূপের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল সে।
ওদের বাড়ির গৃহকর্ম-নিপুণা, লক্ষ্মী বউটার ঠিক একদশা।

* ‘নিমগাছ’ বনফুলের (১৮৯৯-১৯৭৯) অদৃশ্যলোক (১৯৪৭) গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত*

নিমগাছ বিশ্লেষণ
গল্পটি পড়লে আপাতচোখে গল্পে ধরা পড়ে নিমগাছের বর্ণনা, এর পাতা, বাকল, ছায়া ইত্যাদির বাহ্যিক উপকারিতা। কবিরাজ তার চিকিৎসার কাজে, সাধারণ মানুষ প্রাত্যহিক প্রয়োজনে নিমগাছকে অনবরত ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু কেউ এই গাছের সামান্যও যত্ন নেয় না। একজন কবি একদিন নিমগাছের গুণ ও রূপের প্রশংসা করে। কবি যখন অন্য দশজনের মতো না হয়ে নিমগাছটির প্রতি সহানুভূতির দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন ঠিক তখনই নিমগাছটি স্বকাতরে ভালোলাগা কবির সাথে চলে যেতে চাইল কিন্তু পারল না। মাটির গভীরে তার শিকড়। ততদিনে তার শিকড় অনেক দূরে চলে গেছে।
নিমগাছটি বিশেষ দুষ্টিতে দেখলে বোধে কাজ করে, নিমগাছটিই ওবাড়ির বউ। নিমগাছ যেমন উপকারী বউটিও তেমনি উপকারী। নিমগাছকে যেমন ব্যবহার করা হয় বউটিকেউও ঠিক তেমনিভাবে ব্যবহার করা হয়। বাড়ির প্রতি তার ভালোবাসা-দায়দায়িত্ব গভির থেকে গভিরতরে পৌঁছে গেছে। গাছটি যেতে পারে না। এই গল্পের ম্যাজিক-বাক্য হলো শেষটি, যেখানে লেখক পুরে দিয়েছেন সীমাহীন কথার আখ্যান। শেষলাইনে নিমগাছের পরিবর্তে যদি বউটি না আসত তাহলে অণুগল্প হত না। ফুটে উঠত না প্রতীকী বা রূপকভাব, ফুটে উঠত না চিত্রকল্প। গল্পটির বর্ণনা এক আর এর প্রকাশ আরেক। এই গল্পের সংক্ষিপ্ত অবয়বের মধ্যে লেখক বিপুল বক্তব্য উপস্থাপনের যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তা বাংলাসাহিত্যে বিরল।
জগদীশ ভট্টাচার্য বনফুলের অণুগল্প সম্পর্কে বলেছেন, ‘তাঁর বাক্য অলংকৃত অথচ সুন্দর, সরল অথচ বলিষ্ঠ, চিত্তহারী অথচ ক্ষুরধার। রসোক্তিই নয় বক্রোক্তিতেই তাঁর বাগবেদীর শ্রেষ্ঠ বন্দনা।’
এটি যে শ্রেষ্ঠ অণুগল্প তা বোধের সাথে পাঠ করলেই বুঝা যায়। একটি অণুগল্পের যেসব বৈশিষ্ট্য উপরে উপস্থাপন করা হয়েছে তা ‘নিমগাছ’ বহন করে তাই এটি শ্রেষ্ঠ অণুগল্প। একটি গল্প উপরের সবগুলো বৈশিষ্ট্য বহন না করে অধিকাংশ বৈশিষ্ট্য বহন করলেও সেটি অণুগল্প হতে পারে।

নিমগাছ থেকে যেসব উপকার নেয়া হয়
সহজভাব
১. নিমগাছ কবিরাজের ব্যবহারোপযোগী গাছ।
২. ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করে ওষুধ বানানো হয়।
৩. পাতাগুলো ছিঁড়ে শিলে পিষে ওষুধ বানানো হয়।
৪. পাতাগুলো ছিঁড়ে গরম তেলে ভেজে ওষুধ বানানো হয়।
৫. চর্মরোগের অব্যর্থ মহৌষধ অর্থাৎ নিমগাছ দিয়ে খোস, দাদ, হাজা ও চুলকানির ওষুধ বানানো হয়।
৬. কচিপাতা রান্না করে খাওয়া হয়।
৭. কচিডাল মিসওয়াক হিসেবে ব্যবহার করে দাঁত ভালো রাখা হয়।
৮. নিমগাছ যকৃতের পক্ষে খুব উপকারী।
৯. নিমগাছের হাওয়া শরীরের জন্য খুব উপকারী।
রূপকভাব
নিমগাছটি একটি বাড়ির বউ। সে ওই বাড়ির গৃহকর্মী। বউটি লক্ষ্মী এবং কাজে নিপুণ (দক্ষ)। তাই তার নাম ‘নিপুণা’। নিমগাছ থেকে যেমন উপকার নেয়া হয় ঠিক তেমনি বউটির কাছ থেকে উপকার নেয়া হয়। নিমগাছটি পুরোনো তাই তার শেকড় মাটির বহুনিচে নেমে গছে। গাছটির ইচ্ছা করলেও কারো সাথে যেতে পারে না যেমনটি পারে না নিপুণা।
==০==

আরও পড়ুতে ক্লিক করুন
সাহিত্য সংবাদ ।। অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমী শিশুসাহিত্য পুরস্কার-১৪২৪ পাচ্ছেন যারা
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প ।। আকাশবাণী

ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন
বিখ্যাত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়ার কন্ঠে নিজের ছড়া- ‘ঠিক আছে ঠিক আছে’ এর পাঠ
সুমনা শান্তা-এর আবৃত্তিতে কবি আমিনুল ইসলাম মামুন-এর কবিতা- ঢাকার ছবি

সর্বমোট পঠিত: 115

সর্বশেষ সম্পাদনা: জানুয়ারি ১০, ২০২১ at ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ

প্রিজম আইটি: ওয়েবসাইট ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট-এর জন্য যোগাযোগ করুন- ০১৬৭৩৬৩৬৭৫৭