সর্বশেষ লেখাসমূহ:
ক্ষ্যাপা

ক্ষ্যাপা

Print Friendly, PDF & Email

সালাম খান তরুণ

আজকের দিনটা ঠিক স্বাভাবিক দিনের মতো না। আকাশটা মেঘে মোড়ানো। সূর্য কোনভাবেই কালো পাহাড়ের মেঘকে ঠেলে বেরিয়ে আসতে পারছে না পৃথিবীকে দেখতে ও আলো দিতে। চারদিকে আঁধারের মাত্রা বাড়ছে। মুহূর্তের মধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

আমি ছুটি ভোগ করছি বন্ধ ঘরের ঘুমখাটে মশারীর নীচে কোল বালিশ জড়িয়ে। সময় তার নিজ গতিতে এগিয়ে মধ্যাহ্ন’র কাছাকাছি পৌঁছেছে। আম্মু মাঝে মাঝে এসে দরজায় স্বল্প টোকায় পরখ করার চেষ্টা করছে আমার ঘুম ভেঙ্গেছে কি না? কারণ মা জানে ছুটির রাত জেগে জেগে বই পড়ে প্রায় সকালে ঘুমাই আমি। এরই মধ্যে মেঘের প্রচন্ড গর্জনে আমার ঘুম ভেঙ্গেছে। আমি অনুভব করছি বাইরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে।  আমি বিছানার বালিশ থেকে মাথা তুলে মশারী টেনে পাশের জানালা খুলে বৃষ্টি বিলাসী হয়ে উপভোগ করছি উদাস মনে। আমার উদাস দৃষ্টি কখনো কখনো আটকে পড়ছে বিল্ডিং চুঁয়ে চুঁয়ে বৃষ্টির পানি ভাটিতে নামতে দেখে। দেখতে মনে হচ্ছে সাপ নীচের দিকে ছুটছে। বৃষ্টিতে পরিবেশ ও মাটির যে গন্ধ ছড়ায় সেটা মাঝে মাঝে নাকে এসে লাগছে। নির্মল ঠান্ডা বাতাস এসে আমার ত্বকে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বৃষ্টি বাতাসের উগ্র শব্দ শ্রবণেন্দ্রীয়কে জানান দিচ্ছে।

এমন সময় হঠাৎ সম্পাদক সাহেবের কথা মনে ভেসে উঠে। সম্পাদক সাহেব তরুণ রিপোর্টারদের উদ্দেশ্যে প্রায় বলেন- রিপোর্টারদের শুধু দুই চোখ দিয়ে দেখলে চলবে না। ভালো রিপোর্টিং এর জন্য তৃতীয় নয়নকে প্রখর করতে হবে। এর জন্য প্রচুর বই পড়ার পাশাপাশি চারপাশকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

এই কথা ভাবতে ভাবতে মাথায় আসে নিরীক্ষাধর্মী রিপোর্ট লেখার চিন্তা। যদিও চিন্তাটা কয়দিন থেকে আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু শুরু করতে একটা বিষয় নির্বাচন করা দরকার, আর সেটা আমার মনের মতো হচ্ছে না। তাই আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় এই ঝরোঝরো বারিধারা ও রাজপথের চলমান যানের ঐক্যতানিক সংগীতে নিরীক্ষাধর্মী রিপোর্টের বিষয় সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ।

এরই মাঝে ক্ষ্যাপা মনুর অতীত ঘটনার কথা আমার মনে উদয় হয়েছে।  এই ক্ষ্যাপা মনুকে আমি একাধিকবার শহরের একাধিক যায়গায় নানা ঘটনার মূল নায়ক হিসেবে দেখেছিলাম। যদিও এইসব ঘটনার গভীরে  যাওয়ার খুব একটা চেষ্টা করিনি আমি তখন। তবুও সেই সময় যতটুকু জেনেছিলাম তার মূল রহস্য ছিলো  ক্ষ্যাপা মনুর  ইতিবাচক কোন উদ্যোগ। আমি মন স্থির করি ক্ষ্যাপা মনুকে ভালো করে জেনে প্রতিবেদন লেখার। কারণ আমার মনে হয়েছিল তার চিৎকার, আর্তনাদ, বোবা কান্না যা-ই বলি না কেন সেগুলো ছিল সকলেরই মনের কথা।

সেই সাথে আমার স্মৃতির দর্পণে ভেসে উঠে আমার অতীতে দেখা শহীদ মিনারে ’ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল’ পথ নাটকের দৃশ্যগুলি। সেই নাটকে ক্ষ্যাপা পাগলার অসাধারণ ধারালো সুন্দর সংলাপ আমার মনে আজও  গেঁথে আছে। তাই হয়তো আজও মনে পড়ছে নিজের অজান্তেই। যার সাদৃশ্য খুঁজে পাই আজকের এই ক্ষ্যাপা মনু’র মধ্যে।

আমি মৌসুমী চৌধুরী মিতু মেডিকেল কলেজে লেখাপড়া শেষে ডাক্তার হয়েছি সম্প্রতি। কিন্তু সে পেশায় আমি নিয়মিত হতে চাইনি। বর্তমানে সাংবাদিকতা করছি। তারও একটা গল্প আছে।

আমি যখন  ইন্টারমেডিয়েট ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ‘সুকুমার রায় সমগ্র’ বগলদেবে আতœীয় স্বজনের বাড়ি ঘুরছিলাম টানা অধ্যাবসায়ের অবসাদ কাটাতে। ঠিক এমনি এক মুহূর্তে কোন এক চক্রের হাতে গুরুতর আহত হয়ে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন আমার বাবা । খবর পেয়ে  ছুটে গিয়েছিলাম হাসপাতালে।   সেখানে  গিয়ে দেখেছিলাম  এ দেশের স্বাস্থ্য সেবার কী দূরবস্থা!  বাবার ওয়ার্ডে ঢুকতেই আমার সতেজ ইন্দ্রীয়গুলি যেন নানাভাবে আক্রান্ত হয়ে ষষ্ঠ ইন্দ্রীয়কে জানান দিয়েছিল প্রতিরোধের। আমি নাক, মুখ প্রায় বন্ধ করে ফেলেছিলাম। আর দুচোখে যা দেখেছিলাম চারদিকে, সত্যি খুবই কষ্টের ও দুঃখের।

বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে হিমশিম অবস্থায় পড়ে তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি ডাক্তার হয়ে মানব সেবা করার চেষ্টা করবো। যা-ই হোক বাবা ঐ যাত্রায় বেঁচে যান। যদিও পরবর্তিতে বেশ কয়েক বছর পর আবার তাকে খুন হতে হয়েছে সমাজের লুটেরা কুচক্রের হাতে।

আমার বাবা মশিউর রহমান চৌধুরী অকুতোভয়, সৎ, সাহসী ও জনপ্রিয় সাংবাদিক ছিলেন। তিনি কখনো কারো কাছে মাথা নত করে অনিয়মকে নিয়ম বলে দেখতেন না এবং লিখতেন না। তিনি দেশের পুকুরচুরির ঘটনাগুলোকে ধারাবাহিকভাবে পত্রিকায় উপস্থাপনের চেষ্টা করতেন। আর এই জন্য তাকে অতীতে সইতে হয়েছে মামলা, হামলা ও জেল জুলুম। তবুও তাকে দমাতে পারেনি লুটেরা বাহিনী। 

বাবা খুন হওয়ার পর আমরা দিশেহারা ও আতংকিত হয়ে পড়েছিলাম। কারণ আমাদের পরিবারে মা আমি আর আমার ছোট ভাই। নিকট আত¦ীয় স্বজন সবাই ছিল গ্রামে। ফলে এই ঢাকা শহরে টিকে থাকতে হলে আমাকে উপার্জন করতে হবে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বাবার পেশাই হবে আমার পেশা। বাবার পত্রিকার সম্পাদক কে বলেছিলাম আমাকে একটা চাকরি দিতে। সম্পাদক সাহেব খুব খুশি হয়ে আমাকে স্বাস্থ্য বিষয়ক পাতা দেখভাল করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সম্পাদক সাহেব আমার বিষয়ে বেশ ওয়াকিবহাল ছিলেন। কারণ আমি ছাত্র অবস্থায় এই পত্রিকাসহ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ছোট গল্প, ছড়া প্রায় নিয়মিতই লিখতাম।  আমি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম এই পেশায় মানব সেবা ও সমাজ পরিবর্তন করতে অনেক বেশী শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। সুতরাং এই পেশাই হবে আমার মূল পেশা। তাছাড়া ভেবেছিলাম বাবার আদর্শ ও  দর্শনকে ধারণ করতে পারব এই পেশাতে। হাতে তুলে নিয়েছিলাম কলম কাগজ। হয়েছিলাম রিপোর্টার। ক্রমান্বয়ে নেশা চেপে বসল এই কাজে। মনের আনন্দে স্কুটি নিয়ে ছুটছি ঢাকা শহরের আনাচে কানাচে রিপোর্ট সংগ্রহে। আমার সম্পাদক সাহেবও আমার কাজে খুশি হয়ে যাবতীয় সুযোগ সুবিধা বাড়িয়ে দিয়ে সহযোগিতা করলেন ও করছেন এখনও। যদিও আমার এই চ্যালেঞ্জিং পেশা নিয়ে আত্মীয় স্বজনদের অনেকেরই অমত ছিল তখন। কারণ ডাক্তারি পেশা এ দেশে অনেক সম¥ান ও স্বচ্ছলতার নিশ্চয়তা দেয়। এটা অনেকেরই জানা। তারপর মেয়ে বলে কথা। আমিও ভাবলাম পৃথিবীর অনেকেই আন্তন চেখভ এর মতো ডাক্তারি পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় সফল হয়েছিলেন। তাই আমি সাংবাদিক হওয়ারই চ্যালেঞ্জ গ্রহন করেছিলাম । আর এই সাংবাদিকতাই এখন আমার মূল পেশা।

আমাদের সংসারটা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে আমার ছোট ভাই স্কুল পাঠ শেষ করে কলেজে পা দিয়েছে। পরিবারের ঘরের কাজের কিছুটা চাপ কমতে শুরু করছে আমার । 

যাই হোক আমার নিরীক্ষাধর্মী রিপোর্ট লেখার উদ্যোগ হিসেবে ছুটতে শুরু করেছি ক্ষ্যাপা মনুর সন্ধানে।  আমি তাকে যেসব এলাকায় দেখেছি সেসব এলাকায় ঘুরে তার বাড়ির সন্ধান পেলাম তার এক কাছের বন্ধুর মাধ্যমে। সেখানে খুুঁজতে গিয়ে তার হদিস পেলাম না। তার একমাত্র বড় ভাই ও ভাবি তার বিষয়ে এখন আর কিছুই জানেন না জানিয়ে দিলেন। তাদের জানানোর উপস্থাপনাই বুঝিয়ে দিল তারা খুব বিরক্ত ক্ষ্যাপা মনুর বিষয়ে।

এভাবে তার সন্ধান করতে করতে তার সৃষ্ট আরও কিছু ঘটনার অনুসঙ্গ জমতে থাকল আমার লেখার ঝুলিতে। একজন দেয়াল দেখিয়ে বললো-এই যে দেখছেন দেয়ালের এই লেখাগুলো  তার নিজের হাতের লেখা। লেখার ধরণ দেখে আমার মনে হলো- ঢাকা শহরের প্রায় এলাকায় এই ধরণের লেখা দেখা যায়। যার কোন কোন লেখা আমাকেও  থামিয়ে পড়াতে বাধ্য করেছিল। তাহলে কি তারই লেখা? নিজেকে প্রশ্ন করছি? লেখার ধরণ ও কথাগুলো পড়ে মনে হয় ঠিকই তারই লেখা। প্রায় প্রতিটা লেখায় ছিলো মানুষের অন্তরের কথা। তার দেয়াল লেখার স্লোগানগুলো এমন –

  • রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল না হলে

সুন্দরবন ধ্বংস হবে জ্বলে জ্বলে।

  • পেঁয়াজ লবনে খেলছে যারা

দেশ জনতার শত্রু তারা।

  • বৃক্ষ মোদের সকলের জীবন

অযথা বৃক্ষকে করবেন না নিধন।

  • দেশে ভোক্তা আইন ও অধিকারের  প্রয়োগ নাই

সামঞ্জস্যপূর্ণ সামর্থের মধ্যে দ্রব্যমূল্য হওয়া চাই।

  • শিক্ষায় চলছে ব্যাপক বাণিজ্য

এই নীতিকে করতে হবে ত্যাজ্য।

  • সকলেই জানি-স্বাস্থ্য সকল সুখের মূল

স্বাস্থ্য সেবা চলছে সর্বত্র – নীতিতে রয়েছে ভুল।

নানা ছন্দ দিয়ে লেখা তার এসব স্লোগান। মগজ বলল তার আর্তনাদ এখন- মন, মুখ ও হাত বেয়ে রাজপথের দেয়ালে স্থান করে নিয়েছে। একজন ক্ষ্যাপার আর্তনাদ আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে অনেক কিছু’র বোধোদয় করছে।

তার সৃষ্ট যতোগুলো ঘটনা আমার ঝুলিতে জমা হলো, ভালো করে পরখ করে দেখছি একটা ভালো প্রতিবেদন লেখার জন্য যথেষ্ট উপাদান রয়েছে।। মাথায় জেদ চাপলো তার সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত এই প্রতিবেদন লেখায় হাত দেব না। আবারও অভিযানে নেমে সন্ধান করতে করতে অবশেষে জানতে পারি সে এখন পাগলা গারদে। তাকে সেখানে দেখতে গেলাম। ভালো করে দেখেই চমকে উঠলাম। কারণ  তাকে দেখেই আমার স্মৃতিতে ভেসে উঠলো  বাবাকে দেখতে যাওয়ার সময় হাসপাতালে একদিনের ঘটনা। যে ঘটনার মূল নায়ক ছিল এই ক্ষ্যাপা মনু। যদিও তাকে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ঘটনায় দেখেছি জনগনের ভীড়ে আবছাভাবে। তাই হয়তো বুঝিনি যে এ-ই সেই ক্ষ্যাপা মনু। হাসপাতালের ঘটনাটা ছিল এমন-

ক্ষ্যাপা মনু –   এই ওয়ার্ডের দায়িত্বে কে আছেন ? এখানে আসেন প্লিজ।

নার্স –          কি সমস্যা  আমারে কন ।

ক্ষ্যাপা মনু –   হাসপাতালে এতো গন্ধ কেন? টয়লেটের দুর্গন্ধ, ফ্লোর নোংরা, খাবার নি¤œমানের, আপনাদের ডেকে পাওয়া যায় না, ডাক্তার ঠিক মতো আসে না । আপনাদের সুইপার, ডাক্তার, ওয়ার্ডবয় এরা কোথায়? একজন ভালো মানুষ আপনাদের এই পরিবেশে থাকলে এমনিতেই অসুস্থ্য হয়ে পড়বে। তাহলে রোগি ভালো হবে কিভাবে?

নার্স – দ্যাহেন এইহানে চিৎকার পাড়তাছেন ক্যান? সাহস থাকে তো যান পরিচালকরে কন গিয়া ।  এইহানে হৈ চৈ করবেন না।

ক্ষ্যাপা মনু – এইগুলি কাজের কথা বলা হচ্ছে আপনাকে।  আপনি পরিচালককে গিয়ে বলবেন। সেটা আপনার দায়িত্ব। সরকারের বেতন নেন। মনের মধ্যে দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম জাগিয়ে তোলেন। নার্সের বাংলা কি জানেন তো? সেবিকা। অতএব  জনগণ আপনাদের কাছ থেকে সেবা চায়। দয়া করে মানব সেবা করেন মনে প্রাণে।

কয়দিন পর শুনলাম এই ক্ষ্যাপা মনুকে (যার সঠিক নাম মনোয়ার চৌধুরী মনন) অন্য আরেক দিন হাসপাতাল থেকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। তার অন্যায় এইসব কথা বলা। এই  মনন তার এক প্রতিবেশীর সহযোগিতার জন্য হাসপাতালে আসতো মানবসেবার মানসিকতা নিয়ে। সেটা তখনই জেনেছি।

রিপোর্টের প্রয়োজনে আমি প্রায় বিভিন্ন থানায় যাই।  ক্ষ্যাপা মনুকে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন থানায় দেখেছি দুর থেকে আটক অবস্থায় আবছাভাবে। তবে তাকে নিয়ে তখন গভীরভাবে ভাবিনি। পাগলা গারদে যাওয়ার বিষয়টা আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুললো।  আমি এর রহস্য উন্মোচনে প্রাণপণ চেষ্টা শুরু করলাম। চেষ্টার এক পর্যায়ে আবিষ্কার হল তার আপন ভাই-ভাবী  তার সম্পত্তি আত্মসাতের জন্য নানা কায়দায় তাকে পাবনা পাগলা গারদে দিয়েছে।

আদ্যোপান্ত অনুসন্ধানে আরও জানতে পারলাম তারা এমন ঝামেলা শুরু করেছিল পরিবারের মধ্য থেকেই । তারপর তার রাজনৈতিক দল ও নেতার সাথে। এভাবে পর্যায়ক্রমে চলতে থাকে সামাজিক জীবনেও ।

তার এক বন্ধু যিনি আমাকে সব সময় তার বিষয়ে মনে প্রাণে সহযোগিতা করছে এবং যিনি তার বিষয়ে অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী তার কাছ থেকে যা জেনেছি তা অনেকটা এমন-

(ঘটনা এক) ক্ষ্যাপা মনু – ভাইজান আমাদের এই বুটিক শপের আউটলেটগুলোতে অন্যদেশের প্রোডাক্ট রাখা ঠিক হচ্ছে না। যেখানে আমাদের তাঁত, সিল্ক, বেনারশি, জামদানি, খদ্দর, শতরঞ্জী ইত্যাদি অনেক সুন্দর ও জনপ্রিয় প্রোডাক্ট আছে সেখানে আমরা অন্যদের প্রোডাক্ট সেল করে নিজেদেরকে ধংস করব কেন?

বড়ভাই – কাস্টমারের চাহিদা অনুযায়ী তো ব্যবসা করতে হবে ।

ক্ষ্যাপা মনু – আমরা সেল করি বলেই কাস্টমারের চাহিদা তৈরী হয়। তাছাড়া কাস্টমারকে বোঝানোর দায়িত্ব আমাদের সকলেরই। এইসব সমৃদ্ধ শিল্প আজ কি অবস্থায় আছে একবার খোঁজ নিয়ে দেখেছো?

আর অতিরিক্ত লাভের আশায় পণ্য বেশীদিন  মজুদ রেখ না।  স্টক বিজনেস বাদ দাও – ইত্যাদি ইত্যাদি।

(ঘটনা দুই) ক্ষ্যাপা মনু – নেতা কতো নীতি বাক্য, আদর্শ ও দর্শনের কথা এতোদিন শোনালেন। আর ক্ষমতা পেয়ে বুর্জোয়াদের সাথে হাত মিলিয়ে এক হয়ে গেলেন? যেসব শোষক বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সারা জীবন আন্দোলন সংগ্রাম করলাম তারাই আজ আপনার চলার পথের সাথী।  ধিক আপনাদের এইসব ভ- রাজনীতিকে। আমি আর নাই আপনাদের সাথে।

(ঘটনা তিন) ক্ষ্যাপা মনু – ভাইজান টমেটো কতো টাকা কেজি ?

দোকানদার – পঞ্চাশ ট্যাহা। লইবেন কয় কেজি, লন। একটু কমাইয়া রাখুমনি।

ক্ষ্যাপা মনু  – এক কেজি নিতাম ।

দোকানদার   তাইলে কমান যাইতো না। পঞ্চাশ ট্যাহাই লাগবো। দিমু?

ক্ষ্যাপা মনু – ভাইরে গ্রামে এখন দশ টাকা কেজি টমেটো। আর আপনারা দাম নিচ্ছেন পঞ্চাশ টাকা। তার মানে কেজিতে চল্লিশ টাকা বেশী । ভাই দেশ থেকে কি ভোক্তা আইন ও অধিকার উঠে গেলো?  এইসব দেখার কেউ  নাই? যে যেভাবে পারছে লুটপাট করছে!

দোকানদার – এইগুলান বই পড়া কথা এইহানে কইয়েন না। শ্যাষে বিপদ হইবো আপনার।

ক্ষ্যাপা মনু – আমার বিপদ হবে মানে? আমি কি অন্যায় কিছু বললাম যে আমার বিপদ হবে?

(ঘটনা চার)

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে তার ভাতিজাকে সে মাঝে মাঝে নিয়ে যায়। সেখানে  ছাত্রদের লাইনে দাঁড় করিয়ে পিটি শেষে জাতীয় সংগীত সমবেত কন্ঠে গাওয়ানো হয়। তারপর একটা ইংরেজি গান গাওয়ানো হয়। ক্ষ্যাপা মনু একদিন ছাত্রদের সামনে আর শিক্ষকদের পেছনে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন। ইংরেজি গান শেষে সে পেছন থেকে হঠাৎ বলল, স্যার আমি ছাত্রদের উদ্দেশ্যে একটু কথা বলতে চাই। কাইন্ডলি যদি অনুমতি দেন। অনুমতি নিয়ে সে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলল, তোমরা যে জাতীয় সংগীত গাইলে সেটার লেখক কে ? যারা বলতে পারবে তারা হাত তুলে দেখাও। ছাত্রছাত্রীরা চুপচাপ। কয়েকজন হাত তুললো । সে আবার প্রশ্ন করল, তোমাদের মধ্যে কে বলতে পার রবীন্দ্রনাথের লেখা পাঁচটি গল্পের নাম ? সবাই অবাক বিস্ময়ে নিরবতা পালন করছে। কেউ কিছু বলছে না।

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারা, এটা তোমাদের সমস্যা না। এটা সমস্যা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার । আরো অনেক বলার ছিল, কিন্তু বলব না। সকলকে ধন্যবাদ।

তার ঐ বন্ধুর কাছ থেকে তার জীবন বৃত্তান্ত জানা গেছে এরই মধ্যে। সে সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। পরিবারে বাবা মা বিয়োগের পর তার একমাাত্র বড় ভাইয়ের সাথে থেকেই লেখাপড়া করত। সে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল। বই পোকা ও বই পাগল এই ছেলে বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল।  অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করত।  তার প্রকৃত নাম ছিলো মনোয়ার চৌধুরী মনন।

নিয়মিত অফিসের কাজের পাশাপাশি অনেক অনুসন্ধানের পর আমার এই ক্ষ্যাপ মনুর নিরীক্ষাধর্মী প্রতিবেদন লেখা শেষ করে পত্রিকায় প্রকাশ করার যখন উদ্যোগ নিলাম তখন বার্তা সম্পাদক এই প্রতিবেদন প্রকাশ না করার পাঁয়তারা শুরু করল। আমি ক্ষ্যাপা মনুর মতো চিৎকার না করে সম্পাদকের শরণাপন্ন হয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে সক্ষম হলাম। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর সম্পাদকসহ অনেকের বাহবা পেলাম। এরই মাঝে একটা ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন রিপোর্টিং এর উপর  পুরষ্কার ঘোষণা করল। কয়েকজনের অনুরোধে আমার উক্ত রিপোর্ট জমা দিয়ে পুরষ্কার পেয়ে বার্তা সম্পাদককে যথাযথ জবাব দিলাম ।

অন্যদিকে এই রিপোর্টের আলোকে ক্ষ্যাপা মনু মুক্তি পেয়ে আমাদের পত্রিকা অফিসে আমার সন্ধানে ছুটে এল তার ঐ বন্ধুকে নিয়ে। পত্রিকা অফিসে রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে গেল। সম্পাদক সাহেব আমাকে ও তাকে ডেকে সবার উপস্থিতিতে ঘরোয়া সংবর্ধনা দিয়ে দিলেন। সম্পাদক এই ক্ষ্যাপা মনু  বা মনন এর সাথে কথা বলে বুঝলেন সে একেবারে মানষিকভাবে স্বাভাবিক, শিক্ষিত। মেধা ও মননে তেজদীপ্ত প্রাঞ্জল যুবক। তাই আমাকে আড়ালে ডেকে তার সম্পর্কে জেনে  তাকে এই পত্রিকায় চাকরি দেয়ার ঘোষণা দিলেন। মননের মতামত জানতে চাওয়া হলে মনন জানাল সে কাজ করতে পারে একটা শর্তে। আর সেটা হলো যদি তাকে ক্রাইম রিপোর্টার করা হয়। শুরু হলো মননের কর্মজীবন। রং তুলি ও দেয়ালের পরিবর্তে হাতে পেল কলম কাগজ। তার চিৎকারের কথাগুলি সংবাদপত্রে প্রকাশ পেতে শুরু হলো।  এভাবেই আমাদের পথচলার সাথী হলো সে। আমার বিষয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক কিছু জেনে গেল। বাবার খুনের কেসটাকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করতে শুরু করলো।  তারপর যা হলো তা সকলেরই জানা।

টানা বৃষ্টির পর রোদ উঠে প্রকৃতি সতেজ ও নির্মল হয়েছে আজ। তরুলতা ও বৃক্ষের পাতা ঝকমকিয়ে নৃত্য করছে চারদিকে। পশ্চিম দিগন্তে রংধনুর রং খেলা করছে।  সূর্য তার গন্তব্যের নিকটেই পৌঁছেছে। পাখিরা তাদের নিজ নিজ ডাকে আবহসংগীতে নীড়ে ফিরছে।  জোৎস্নার আভা আঁধারকে অতিক্রম করে স্নিগ্ধ আলোর প্রবাহ বিস্তার করছে।  আমি আর মনন নব উদ্যোমে ছুটছি আপন গন্তব্যে।

আরও পড়ুতে ক্লিক করুন
বাংলা সাহিত্য লেখক অভিধান

প্রবন্ধ- অণুগল্পের ব্যাকরণ

নোবেল পুরস্কারের জন্য যেভাবে আবেদন করবেন

ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন

বিখ্যাত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়ার কন্ঠে নিজের ছড়া

বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা

শেষ বিদায়ের গান ।। আপন ঘর ।।

সর্বমোট পঠিত: 112

সর্বশেষ সম্পাদনা: জুন ৩, ২০২১ at ৭:১৫ পূর্বাহ্ণ

প্রিজম আইটি: ওয়েবসাইট ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট-এর জন্য যোগাযোগ করুন- ০১৬৭৩৬৩৬৭৫৭