সর্বশেষ লেখাসমূহ:
এক জীবনের গল্প (পর্ব-৬)

এক জীবনের গল্প (পর্ব-৬)

Print Friendly, PDF & Email

আমিনুল ইসলাম মামুন

সময় দ্রুত করে বয়ে চলল। এরই মধ্যে জীবনের অনার্সের রেজাল্ট হল, সে ভর্তি হলো মাস্টার্সে। অপূর্বা আর আলোর ডিগ্রীর ক্লাসও শুরু হল মাস গড়িয়েছে। আলো একদিন মাকে ডেকে বসালো তার রুমে। বলল, জীবনকে নিয়ে তার স্বপ্নের কথা, আশা-আকাঙ্খার কথা যা সে আজো বলতে পারেনি জীবনকে। আলোর মা শোনলেন নীরবে। এরপর আরো কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, এ সম্ভব নয় আলেয়া। তোর আর জীবনের মাঝে যে অনেক ব্যবধান।
আলো বলল, তা কেমন মা?
: জীবন অতি শান্ত প্রকৃতির ছেলে। জ্ঞানের দিক থেকে তার মতো ছেলে কমই হয়। আর যে যেমন তার জন্য তেমনই জোটাতে হয়। তাছাড়া ওর বাবা-মা’র এতো সকালে এমন কোন ইচ্ছা আছে বলে আমার জানা নেই। ছেলে মানুষ। পড়া-লেখা শেষ করবে, চাকরি নেবে, তারপর হয়তো ভাববে তার বাবা-মা এবং সেও।
: কিন্তু জীবন ভাই কি এখনই ভাবছে না?
: ও কি ভাবছে, কিভাবে ভাবছে তা বুঝে ওঠা সত্যিই দুস্কর। তবে ও ভুল করার মতো ছেলেও নয় ; ওর ছোট্র অতীত তাই বলে।
: তবে মা তুমি কি চাও তোমার ভাইয়ের ছেলে অপূর্বাকে নিয়ে ভবিষ্যত গড়ার স্বপ্ন দেখুক?
আলোর মা কিছুটা রেগে ওঠলেন আলোর ওপর। বললেন, সেটাও সম্ভবের বাহিরে। হয়তো ভুল করে সে ক্ষণিকের মোহে মরিচিকার পেছনে ছুটছে আর মরিচিকা ছুটছে খাঁটি বস্তুটির দিকে। কিন্তু এ ভুলের মধ্যেই যে সে ডুবে থাকবে তা ভাবাটাও ঠিক হবে না আলেয়া।

মায়ের কথা থেকে আলো তার রেগে ওঠা তেমন বুঝতে না পারলেও যখন দেখল তিনি কথা শেষ করে আর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে উঠে চলে গেলেন, তখন আর বুঝতে অসুবিধা হলো না। তখন আলোর বোধদয় হল যে, মায়ের সাথে এভাবে এতো খোলামেলাভাবে কথাটা বলা তিনি মেনে নিলেও তা যে সহজের নয় তা তার উঠে যাওয়া থেকেই স্পষ্ট। কিছুক্ষণ মৌন থেকে সে রান্না ঘরে গিয়ে মায়ের সাথে কাজে যোগ দিল তাকে কিছুটা হালকা করার জন্য।

আলো রান্না ঘরে মায়ের পাশে বসে আরেকটা বটি নিয়ে তরকারি কুটতে লাগল। মনে তার ভেসে ওঠে জীবনকে নিয়ে নানা কল্পনা, নানা অতীত। আর মাঝে মাঝে সে চোখ তুলে তাকায় মায়ের মুখের দিকে। হঠাৎ একবার চোখাচোখি হয় দু’ জনে। মা বললেন, কিছু বলবি মনে হয়- বলেই তিনি আবার তরকারি কুটতে লাগলেন।
আলো বলল, মা, জীবন আর আমার মাঝে বিদ্যমান ব্যবধানটা কি অনতিক্রম্য?
আলোর মা’র ত্রে“াধের যেন বাঁধ ভাঙ্গল। ‘লেখাপড়া শিখে কি লজ্জা শরমের মাথা খেয়েছিস?…’ ইত্যাদি বলে তিনি ইচ্ছা মতো বকলেন আলেয়াকে।

আবেগ আলোয়াকে ঘিরে আছে বহুক্ষণ থেকে। নইলে মাকে কিছুটা হালকা করতে গিয়ে তা কেন ক্রোধের কারণ হয়ে উঠবে ওই আবেগ প্রবণ একটি কথা বলে। তরকারি কুটা শেষ না হতেই সে উঠে এসে বসল তার রুমের চেয়ারে। চোখ দু’টি তার পানিতে ছলছল করে ওঠলো। দু’ ফোটা গড়িয়েও পড়ল নিচের দিকে।
ঠিক পরদিন জীবন বাসায় এলো। ফুফুর সাথে কথা শেষ করে সে আলোর রুমে বিছানার ওপর পা তুলে বসল। আলো বসলো পড়ার টেবিলের সামনে। চেয়ারটা ঘুরিয়ে সে জীবনের দিকে মুখ করে বসা। কুশলাদি বিনিময় পর্বটা পূর্বেই হয়ে গেছে। জীবন অপূর্বার কথা জিজ্ঞেস করতেই আলো বলল, জীবন ভাই, ওর জীবনে আপনি এখন শুধুই অতীত। বিশ্বাস করা বা না করা দু’টিই আপনার ব্যাপার।
কয়েকদিন আগেও জীবন যখন এসেছিল আলোদের বাসায় তখন অপূর্বা সম্পর্কে জীবনের এক প্রশ্নের জবাবে আলো বলেছিল, অপূর্বা এ মুহূর্তে তার জীবনের সাথে কাউকে জড়াতে চায় না। একাকীই থাকতে চায় সে আপাতত। অপূর্বার এমন জবাব জীবন হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল, অপূর্বা ছাড়া যদি জীবন বাঁচতে না পারে, জীবন ছাড়া অপূর্বা বাঁচে কেমন করে? আলো বলেছিল, বাঁচা না বাঁচা আপনাদের ব্যাপার… ইত্যাদি।
কিন্তু আজকের কথাটি জীবন বিশ্বাস না করে পারল না যখন অপূর্বার টেবিলের ওপর দেয়ালে লাগানো সেই পংক্তিগুলো অক্ষত অবস্থায় জীবনের দিকে বাড়িয়ে দিল কথাটি বলতে বলতে। জীবন হাত বাড়িয়ে সেই পংক্তিগুলো নিতেই যেন চমকে ওঠল। বুকের ভেতর তার একটা সশব্দ কাল বোশেখী বইতে শুরু করল। ভাল করে দেখে নেয় সে সেই কাগজটি। সত্যিই তাই! জীবনের মুখ দিয়ে কোন কথা সরে না। সে আলোকে লক্ষ্য করে কিছু একটা বলতে চায় কিন্তু বলতে পারে না। আলো বুঝতে পারে। সে ভাবতে থাকে কিভাবে সে এ মুহূর্তে জীবনকে বলবে অপূর্বার জীবনে আসা দ্বিতীয় ছেলেটির কথা। ভেবে এক সময় সিন্ধান্ত নেয় এই মুহূর্তে না বলার। বেশ কিছু সময় উভয়ে নীরব থাকার পর জীবন আবেগ জড়ানো কণ্ঠে বলে, এ কি করে সম্ভব আলো! জীবনে এই প্রথম অংক কষে ফল মিলালাম। ভাবলাম ভুল হতে পারার ধারণাটাই ভুল হবে।
আলো কোন কথা বলে না। সে বুঝতে পারে জীবনের প্রতিটি রক্ত কণিকায় মিশে আছে অপূর্বা। এ সহজে ঝেড়ে ফেলার মতো নয় । এ আঘাত তাকে কতটা আহত করতে পারে তা অননুমেয় নয়। কিন্তুু নিজের এ বোধশক্তির কাছে হার মানে সে। অপূর্বা যেমনি করে বিরাজমান জীবনের মাঝে, তেমনি করে যে আলোর মাঝেও বিরাজমান জীবন।
জীবনের ভালবাসায় ছিল না কোন খাঁদ। তাই কষ্টের বিষাক্ত তীরটাও তার মস্তিস্কে বিদ্ধ হয় সবেগে। বিদ্ধ হওয়া এ বিষাক্ত তীরের যন্ত্রণা জীবনের জীবন প্রবাহ কোনদিকে বেঁকে নিয়ে যায় তা একমাত্র ভবিষ্যতই বলতে পারে। জীবনের প্রথম প্রেম বলেই জীবনের মাঝে আবেগ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। কিন্তু এতদিন তা ছিল সু-নিয়ন্ত্রিত। আজ যেন তা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এলোমেলো পথে গতি নিতে শুরু করেছে শুধুমাত্র তার লেখা আর অপূর্বার সাজানো সেই পঙক্তিগুলো হাতে পেয়ে। আবেগ জড়ানো কণ্ঠে সে আলোকে বলে, অপূর্বার কাছে যদি আমি অতীত হই তাহলে বর্র্তমানটা তুই আমাকে খুলে বল।

আলো চুপ থাকে। জীবন পুনরায় তাকে অনুরোধ করলে সে আরো কিছুটা সময় চুপ থেকে তারপর বলল, আমাদের ক্লাশ শুরু হল কিছুদিন হল। সপ্তাহখানেক পূর্বে আমি আর আপূর্বা যখন ক্লাস শেষে বের হলাম দেখলাম অপরিচিত অনেক ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে আরো একটি অপরিচিত ছেলে যে কিনা আমাদের পথ আগলে দাঁড়াল। নতুন ক্লাস, নতুন ক্যাম্পাস। সর্বোপরি সম্পূর্ণ নতুন একটা পরিবেশ। এমন পরিবেশে মদ্যপ, মাতাল, রক্ত ওঠা চোখ নিয়ে একটা ছেলে আমাদের সমনে দাঁড়ালে আমাদের যে কি করার আছে তা আমরা ভেবে পাচ্ছিলাম না। বরং ভড়কে গেলাম আমরা। সে বলল, অপূর্বাকে সে পছন্দ করে। জানা নেই, শোনা নেই অথচ সে বলছে এমন কথা। আমরা ধরে নিয়েছি সে একটা বিকৃত মস্তিষ্কের লোক। শেষে কোন কথা না বলে আমরা পাশ কেটে চলে আসি।

পরদিন ক্যাম্পাস থেকে বের হবার পথে গেটে দেখলাম তাকে। কিন্তু কিছু বলল না। সঙ্গে সঙ্গেই আমরা একটা রিক্সা নিলাম। কিছুদূর যেতে না যেতেই দেখি আমাদের সামনে একটি রিক্সা এসে থেমেছে। আমাদের ড্রাইভার রিক্সা না থামিয়ে পারল না। আমরা দু’ জনেই রিক্সাতে বসা। ছেলেটি পকেট থেকে একটি গোলাপের কলি বের করে অপূর্বার হাতে দিয়ে বলল, এটি আপনার জন্য।

তারপর সে রিক্সায় উঠে চলে গেল। পরদিন আমরা খোঁজ নিয়ে জানলাম ছেলেটিও আমাদের সাথে ভর্তি হয়েছে অন্য ডিপার্টমেন্টে। ইন্টার পাশ করেছে এ কলেজ থেকেই। দ্বিতীয় বর্ষে থাকা অবস্থাতেই সে বখে যায় সঙ্গ দোষে। তার পদচারণা শুরু হয় অন্ধকার জগতেও। সরকারী কলেজ বলে যে যে যার যার মত করে চলে। ছাত্র-শিক্ষক কেউই কারো ব্যাপারে প্রয়োজন ছাড়া নাক গলাতে চায় না। ছেলেটির এমন আচরণ অব্যাহত থাকে। কিন্তু ছেলেটিকে তেমন ক্ষতিকর মনে হয়নি অপূর্বার কাছে। তাই অপূর্বা ছেলেটিকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে। গতকাল অপূর্বা আমার হাতে আপনার লেখা এই কবিতাটি দিয়ে বলল আপনাকে দিতে আর বলার জন্য ওকে ক্ষমা করতে। আমাকে লক্ষ্য করে বলল, তোর সাথে আমার একটা দুরত্ব তৈরী হয়ে গেল আমার নতুন অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে- এই বলে সে চলে গেল। আমি ওকে ডাকলাম। কিন্তু সে পেছনে একটিবারের জন্যও তাকালোনা। আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম। আজও ক্লাশে এসেছে সে। দায়সারা গোছের একটু কথা বললেও বসেছে আলাদা বেঞ্চে। ভীষণ কষ্ট হল আমার। যার সাথে এতগুলো সময় কাটালাম, সে আজ সরে গেল দূরে। – কথাগুলো বলতে বলতে আলোর কণ্ঠ যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। তাকিয়ে দেখে জীবনের চোখে পানি টলমল করছে। পানি টলমল চোখ নিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান হলো জীবনের।

রোকনের সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠার পেছনে প্রথম দিকে অপূর্বার ইচ্ছার ঘাটতি থাকলেও দিন যতই গড়াতে লাগল ততই সে ঘাটতি পূরণ হতে থাকে। কিন্তু অতীত স্মৃতি তাকে মাঝে মাঝে নাড়া দিয়ে যায়। আর সেটুকু এড়াতে একসময় রোকনের প্রতি তার ভালবাসার অপূর্ণ অংশও পরিপূর্ণ করে নেয় সে। ক্যাম্পাসে একত্রে হাঁটা-চলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র পর্যন্ত দুই জনের পদাঙ্ক অঙ্কিত হয় পাশাপাশি। তার সমগ্র সত্তা জুড়ে এখন শুধু রোকনের আবাস। শুধু মাঝে মাঝে একটু আধটু মনে পড়ে জীবনকে। তাও স্বাদহীন অন্য দু’ দশটি স্মৃতির মতো। কিন্তু দিন দিন হতাশা চেপে ধরে জীবনকে। সে হতাশা থেকে মুক্তি পেতে চায়। কিভাবে মিলতে পারে এ মুক্তি আমি’র কাছে জানতে চায় সে। আমি বলে, ঘটে যাওয়া অতীতকে অস্বীকার করতে। জীবন বলে, আমার প্রেমকে তুই এতোই মূল্যহীন ভাবছিস যে আমি সেটি ভুলে যেতে পারি?

: তাহলে জোর করে আদায় করে নে – ভ্রু কুঁচকে বলে আমি।
: সে তো দেহ, মন নয়। সোনালী ডিম ধারণ করা নীড়কে মূল্যবান স্থানে রাখা গেলেও মূল জিনিসটি দখল না নিয়ে কোন লাভ নেইরে আমি। বলতে বলতে দাঁড়ায় সে, আর হাসে। হাসতে হাসতে চলে যায় সে। আমি’র কাছে সেই হাসি কেমন যেন মনে হয়।
আমি’র প্রকৃত নাম আমির আলী। অতি হেয়ালী স্বভাবের সে। যখন যা মন চায় তখন সে তাই করে। অন্যদের তুলনায় আলাদা কিসিমের বলে অন্যরা তার নামে কিছুটা ভিন্নতা এনে তাকে আমি বলে ডাকে।

আজ হঠাৎ আলোদের ক্যাম্পাসে আগমন জীবনের। ইন ছাড়া শার্ট পরা তার। শেভ হয়নি সপ্তাহ খানেক হল। শরীরটাও ভেঙ্গেছে কিছুটা। মুখের হাসিটা উবে গেছে এরও আগে। ক্লাস শেষে শহীদ মিনারের কোলে জীবনকে বসে থাকতে দেখে আলো স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা দ্রুত গতিতে হেঁটে আসে তার দিকে।
: কেমন আছেন জীবন ভাই। এখানে কেন, বাসায় চলেন।
: বেশ ভাল আছি। এখানে এসেছি প্রাণের খোঁজে।
: চলেন, বাসায় কথা হবে। আমিও আপনার অপেক্ষায় ছিলাম। – এই বলে সে জীবনের হাত ধরে তাকে বসা থেকে টেনে তুলল। জীবন দাঁড়াল। বলল, আমার ভেতর যে আগুনের লেলিহান শিখা। এ শিখা শব্দ রূপে নিঃসৃত হবার পর হ্রদয় পোড়াতে পারে। তার চেয়ে বরং এখানেই বসি।
আলো বললো, আজ সবাই কাকার বাসায় গেছে। আসবেন সন্ধ্যায়। আমি বাসায় তালা লাগিয়ে এসেছি, চলেন।
আলো হাঁটতে শুরু করল। শেষে পেছন পেছন অগ্রসর হতে লাগল জীবনও।
তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করে আলোর রুমে গিয়ে বসল দু’ জনে। একটু পরেই আলো ওঠল। জানালার পর্দাগুলো তুলে দিয়ে ভেতরে গেল সে। অল্প সময়ের মধ্যেই মিষ্টি আর কোমল পানীয় নিয়ে এলো ফ্রিজ থেকে । একটি রসগোল্লা নিজে কাটা চামচ দিয়ে তুলে নিয়ে প্লেটটা এগিয়ে দিল জীবনের দিকে। সেও নিল। আলো নিজ থেকেই বলল, আজ অপূর্বাকে ক্লাসের শুরুর দিকটায় দেখেছি, শেষের দিকটায় দেখিনি।
আলোর কথা শেষ হতেই জীবন বলল, কেমন আছে সে?
: ভাল। খুব ভাল।
অবুঝ শিশুর মতো জীবন বলল, আমার কথা কিছু জিজ্ঞেস করে?
আলো এ কথার কোন জবাব না দিয়ে বলল, রোকন আর অপূর্বার সম্পর্কটা এখন খুবই চমৎকার। অনেক ছেলে-মেয়ের কাছে রীতিমতো ঈর্ষণীয়। মানুষ বলে, অভ্যাস নাকি বদলানো যায় না। কিন্তু রোকন তা পেরেছে। আমাদের অনেকের সাথে ওর মাঝে মধ্যে কথা হয়। ওকে বন্ধু হিসেবে আমাদের মোটামুটি ভাল লাগে।
কথাগুলো আলো চমৎকারভাবে বলে গেলেও জীবনের ভেতরটা যেন ভেঙ্গে-চুরে একাকার হয়ে যাচ্ছে। অনেকটা সময় চুপ থেকে তারপর সে বলল, তুই আমাকে একটা কাজ করে দিতে পারবি আলো?
: সম্ভবের মধ্যে হলে কেন দেব না, অবশ্যই দেব।
: আমাদের দূরত্বটা তুই দূর করে দিবি। পারবি না?
: এটি এখন আর কিছুতেই সম্ভব নয় জীবন ভাই। হাঁড়ি একবার ভাঙলে সেটা কি জোড়া নেয়? নেয় না। নিলেও আগের মতো কাজ হয় না।
আলোর কথাটা জীবনের তোলপাড় করা বুকের ভেতরটায় কষ্টের ঢেউ বইয়ে দিয়ে পড়ো পড়ো আশার তীরটা যেন বেশ কিছু দূর ভেঙ্গে দিল। সেই ঢেউ বুক ভেদ করে ভাসিয়ে দিল পুরো চোখের জমিন। টস্টস্ করে পানি পড়তে থাকে। জীবন মাথাটা নিচুই করে রাখে। চোখ দু’টি তার রক্তবর্ণ হয়ে উঠল। আলো জীবনের পাশে গিয়ে বসে। জীবনের এমন অবস্থা দেখে ওর চোখ দু’টিও ঝাপসা হয়ে আসে পানিতে। কিন্তু বাঁধ ভাঙ্গে না। দু’ হাতে জীবনের মাথাটা তুলে ওর চোখে তাকিয়ে বলল, আমি কি পারি না অপূর্বার শূন্য স্থানটা পূরণ করতে?
জীবন নিজেকে সামলে নিয়ে ভেজা চোখে বলল, সে তো মিথ্যে শান্ত্বনা। তাছাড়া…।
জীবনের কথা শেষ না হতেই আলো বলল, এ মিথ্যে শান্ত্বনা নয় জীবন ভাই। এ আমার বুকের ভেতর এতকাল জমে থাকা স্বপ্নের প্রকাশ।
: এও যে সম্ভব নয় আলো। অপূর্বা মিশে আছে আমার রক্তের প্রতিটি কণায়, প্রতিটি নিঃশ্বাসে। দেহের সব রক্ত ফেলে দিয়ে কি নতুন করে প্রবেশ করানো যায় আলো? যায় না। তার পূর্বেই মৃত্যু ঘটে মানুষটির।
জীবন উঠে চলল বাসার উদ্দেশ্যে। আলোর কাছে এ ব্যাপারে সাহায্য প্রার্থনা করাটা যে অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কিছুই হবে না, তা সে অনুমান করে নেয়।

শান্ত চাচার দোকানটায় দু’ চারজন কাস্টমার দেখা যাচ্ছে। জীবন বাহির থেকে তাকিয়ে দেখে। ওদের কাউকে তার পরিচিত মনে না হওয়ায় দোকানে ঢুকে সে। একটা চা আর একটা সিগারেট দিতে বলে ছোট্ট ছেলেটাকে। ওর নাম রাজা। রাজা সিগারেট আর চা দিয়ে যায়। সঙ্গে একটা দেশলাইয়ের বক্স। কয়েক চুমুক চা খাওয়ার পর সিগারেটটা ধরায় সে। ধোঁয়াটা ভেতরে নিতেই তালুতে উঠে যায়। সঙ্গে সঙ্গে কাশতে শুরু করে। শান্ত চাচা এগিয়ে আসেন। এক গ্লাস পানি ঢেলে দিয়ে হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে চায়ের প্লেটে রেখে বললেন, যেটা যার কাজ না, তাকে সেটা করতে যাওয়াও ঠিক না। রাজা এক কাপ দুধ দিয়ে যা, সরসহ। পানিটুকু খেয়ে নাও।
রাজা দুধ নিয়ে এল। জীবন বলল, এখন খাব না চাচা উঠি।
: উঠবা কেন বাবা, আরেকটু বসো। আজকের গরুর দুধটা কিন্তু খুব ভালো।
: না চাচা, খাবো না।
: তাহলে ছাগলেরটা দেই?
জীবন মাথা নাড়ল। না বোধক জবাব পেলেন শান্ত চাচা।
: তোমার হইছে কী জীবন? দিন দিন ঘাটি যাইতেছ। ক্যামন ক্যামন যেন মনে হয় তোমারে। কারণডা কি খুইলা কওন যাইবো?
জীবন কোন জবাব না দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, যাই চাচা। এই নেন টাকাটা – বলেই সে মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিয়ে হাঁটতে লাগল। পেছন থেকে রাজা ডাক দিয়ে বলল, সিগারেটটা নিয়া গেলেন না?
জীবন শোনেও না শোনার ভান করে বেরিয়ে গেল। রাজা টেবিলটা মুছতে লাগল। শান্ত চাচা চিন্তিত চোখে জীবনের চলে যাওয়া দেখে মনে মনে বলল, জীবনটার কি থেকে কি হলো, সামনেইবা কি হয় কে জানে! আহ্! – একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শান্ত চাচা।

রাত গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠল। বালিশের কোলে মাথা রাখা জীবন শত চেষ্টা করেও চোখের পাতা মিলাতে পারে না। এপাশ ওপাশ করতে করতে এক সময় শোয়া থেকে উঠে বসে। কিছু সময় গম্ভীর হয়ে বসে থাকার পর লাইটটা জ্বালিয়ে টেবিলে গিয়ে বসে। অপূর্বাকে একখানা চিঠি লিখবে বলে মনস্থির করে। রাইটিং প্যাড নেই বলে লিখবার খাতা থেকে দু’টি পাতা ছিঁড়ে নেয়। তারপর কলমটা খুলে বসে। কিন্তু লেখা হচ্ছে না এক কলমও। লিখবার কথাগুলো ভেতরেই কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লিখবার ইচ্ছাতে ঘাটতি নেই তার। ভেতরের অব্যক্ত ভাষাগুলো তাকে কষ্টে অস্থির করে তোলে। বুক যেন তার ফেটে যেতে চায়। চোখ ভরে ওঠে পানিতে। কিছুক্ষণ পর তাকিয়ে দেখে লিখবার পাতাগুলোর অনেকটা ভিজে গেছে চোখের পানিতে। কলমটা হাত থেকে ছেড়ে দিয়ে বাতিটা নিভিয়ে আবার মাথা ঠেকায় বালিশের গায়। কষ্ট যেন তাকে আরো চেপে ধরে। ঠোঁট কামড়িয়ে এবার সে কষ্টের দাপাদাপি ঠেকাতে নিজেই চেপে ধরে নিজের বুক। তার কাছে মনে হয়, তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরার সাথে সাথে বাইরে ডাল ছড়ানো আম্র বৃক্ষটি থেকেও ঝরে পড়ছে গাছের প্রতিটি পাতা। সেই পত্র পতন শব্দ তিমির রাতের নীরবতা ভেঙ্গে ঝন্ঝন্ শব্দে তার কানে এসে বাজে। আবার শোনতে পায় সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত নারকেল বৃক্ষের পাতার ঝন্ঝন্ শব্দ থেকে শান্ত্বনার বাণী – ‘ঘুমিয়ে পড় জীবন…’।
গভীর রাতের নিস্তব্দতায় নদী যেমন কলকল শব্দে বয়ে চলে স্বচ্ছ জলের ধারায়, তেমনি করে শান্ত্বনার বাণী শোনতে শোনতে চোখের নদীর অশ্রুধারা বইয়ে দিতে দিতে নিজের অজান্তে কখন যে চোখ দু’টি তার বুঁজে আসে তা সে নিজেই জানে না।

ভোর হল। মসজিদে ফজরের আজান হল বেশ কিছুক্ষণ পূর্বে। মা নামাজ শেষ করে জীবনের ঘরে এসে বাতিটা জ্বালালেন। দেখলেন জীবন গভীর নিন্দ্রায় আচ্ছন্ন। টেবিলের উপর দৃষ্টি পড়তেই এগিয়ে এলেন। দেখলেন, সাদা পৃষ্ঠাগুলোর কিছু অংশ পানিতে ভিজে তারপর শুকিয়ে কিছুটা বেকে-কুঁকে আছে। তিনি এর কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা না করে বতিটা নিভিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

দিনটা বেশ আলোকউজ্জ্বল। ফুরফুরে বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে সেই সকাল থেকেই। সূর্যটা হেলে আছে পশ্চিমাকাশে। আজ আলো কলেজে থাকতেই জীবন তাদের বাসায় যায়। ফুফুর সাথে কথা বলে এক ফাঁকে আলোর পার্সোনাল ডায়েরী থেকে অপূর্বার বাসার ফোন নাম্বারটি নিয়ে নেয় সে। ওর নিজের কাছেও ছিল নাম্বারটি। ইনডেক্সটি হারিয়ে গেছে বেশ কিছুদিন পূর্বে। জীবন দোকান থেকে ডায়াল করে। রিসিভার তোলে কাজের মেয়েটি। এ পাশ থেকে কণ্ঠ শুনেই জীবন বুঝতে পারে এ অপূর্বার কণ্ঠ নয়, নয় তার মায়ের কণ্ঠও। পরিচয় জানতে চাইলে জবাব আসে-
: জরিনা।
: আমি অপূর্বাকে চাইছি।
: আপনার নাম কি?
: জীবন।
: জরিনা রিসিভারটা রেখে অপূর্বাকে বলল। অপূর্বা বেশ আগ্রহ নিয়ে তড়িৎ এলো ফোন সেটের কাছে। ক্ষণিকের জন্য যেন সে ভুলে গিয়েছে জীবনের সাথে তার সম্পর্কের মাটি চাপার কথা। একটু থেমে তারপর যেন স্মরণে এলো বিষয়টি। ধীরে হাত বাড়িয়ে রিসিভারটা তুলে নিয়ে বলে-
: কেমন আছ?
: খোদার পর যেমন রেখেছ। তুমি?
অপূর্বা কোন জবাব দেয় না। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে জীবনের মুখখানি বেদনার এক প্রতীক রূপে। মনে পড়ে অতীতের কিছু খন্ড স্মৃতি। নিজেকে অপরাধী মনে হয় তার। খুবই খারাপ লাগে।
: চুপ করে আছো যে অপূর্বা?
অপূর্বার কাছ থেকে জবাব না পেয়ে জীবন বলে, আলোর কাছ থেকে অনেক কথা শুনেছি। তোমার সাথে দেখা করতে ইচ্ছে করছে। কখন কোথায় সেটা তোমার ইচ্ছা! এই অপরাধী যদি কোন অপরাধ করে থাকে তাহলে সে তা জ্ঞাত হতে চায়, নিজেকে শুধরে নিয়ে মুক্ত বাতাসে দু’ হাত ছড়িয়ে তারপর জড়িয়ে নিতে চায় তার স্বপ্নকে, স্বর্নালী ভবিষ্যতকে। আমি যে আর সইতে পারি না অপূর্বা! কিছু বলো, চুপ করে থেকো না! – বলতে বলতে জীবনের চোখের কোণে অশ্রু জমে ওঠে। ওপাশ থেকে শোনতে পায়, ‘এই অপরাধীকে ক্ষমা কর জীবন। আমি অতীতকে ভুলবার চেষ্টা করছি। যদি তুমি একটি মুহূর্তের জন্যও আমাকে ভালবেসে থাক, তাহলে সেই দাবী নিয়েই বলছি, তুমিও আমার মতো অতীতকে ভুলে যাও জীবন।’

জীবন চোখের সামনে দেখতে পেল বিশাল আকাশ দু’ পাশে ভেঙ্গে পড়ছে আর তার অন্তরালে থাকা নিকশ কালো অন্ধকার গ্রাস করে নিচ্ছে জগৎটাকে।
রিসিভারটি রেখে দিয়ে অপূর্বা নিজের রুমে গিয়ে বসে থাকে আর নিজের অজান্তেই তার চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে ক’ফোঁটা অশ্রু।
জীবন ফোনের দোকান থেকে বেরিয়ে পড়ল। বুকের ভেতর দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনকে নেভাতে সে রিক্সা নিয়ে রওনা হয় বারের দিকে।

(চলবে)

বইটি সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন: এক জীবনের গল্প

সর্বমোট পঠিত: 232

সর্বশেষ সম্পাদনা: জানুয়ারি ২৩, ২০২১ at ৭:০৮ পূর্বাহ্ণ

প্রিজম আইটি: ওয়েবসাইট ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট-এর জন্য যোগাযোগ করুন- ০১৬৭৩৬৩৬৭৫৭